ডায়াবেটিস কোন অঙ্গের কারণে হয়? অগ্ন্যাশয়ের ভূমিকা সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা
ডায়াবেটিস একটি বহুল পরিচিত কিন্তু প্রায়ই ভুলভাবে বোঝা রোগ। অনেকেই প্রশ্ন করেন—ডায়াবেটিস আসলে কোন অঙ্গের সমস্যার কারণে হয়? উত্তরটি এক কথায় বলা যায়—অগ্ন্যাশয় (Pancreas)। এই ছোট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটির সঠিক কাজ ব্যাহত হলেই ডায়াবেটিসের মতো গুরুতর সমস্যা দেখা দেয়। তাই ডায়াবেটিসকে বুঝতে হলে আগে জানতে হবে অগ্ন্যাশয়ের ভূমিকা কী এবং এটি কীভাবে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে।
অগ্ন্যাশয় কী এবং এটি কোথায় থাকে?
অগ্ন্যাশয় আমাদের শরীরের একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থি, যা পেটের ভেতরে পাকস্থলীর ঠিক পিছনে অবস্থিত। এটি দেখতে লম্বাটে এবং এর কাজ মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত—
১) হজমে সাহায্য করা
২) রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা
ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রে মূলত দ্বিতীয় কাজটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অগ্ন্যাশয় কীভাবে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করে?
আমরা যখন খাবার খাই, তখন খাবার ভেঙে গ্লুকোজে পরিণত হয় এবং তা রক্তে মিশে যায়। এই গ্লুকোজ শরীরের শক্তির প্রধান উৎস। কিন্তু গ্লুকোজকে কোষের ভেতরে ঢুকতে সাহায্য করার জন্য প্রয়োজন ইনসুলিন নামক একটি হরমোন।
এই ইনসুলিন তৈরি করে অগ্ন্যাশয়ের বিশেষ কোষগুলো, যেগুলোকে বিটা কোষ বলা হয়। ইনসুলিন রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। অগ্ন্যাশয় ঠিকভাবে কাজ না করলে বা পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি না হলে রক্তে শর্করা বেড়ে যায়, যার ফলেই ডায়াবেটিস হয়।
অগ্ন্যাশয় ও টাইপ ১ ডায়াবেটিসের সম্পর্ক
টাইপ ১ ডায়াবেটিসে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে শরীর প্রায় সম্পূর্ণভাবে ইনসুলিন তৈরি করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় রোগীকে বাইরের উৎস থেকে ইনসুলিন নিতে হয়।
এই ধরনের ডায়াবেটিস সাধারণত শিশু বা কিশোর বয়সে শুরু হলেও যেকোনো বয়সেই দেখা দিতে পারে। এখানে মূল সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু হলো—অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যাওয়া।
অগ্ন্যাশয় ও টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ভূমিকা
টাইপ ২ ডায়াবেটিসে অগ্ন্যাশয় শুরুতে ইনসুলিন তৈরি করলেও শরীর তা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না। একে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বলা হয়। এই অবস্থায় অগ্ন্যাশয় অতিরিক্ত ইনসুলিন তৈরি করতে গিয়ে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইনসুলিন উৎপাদন কমে যায় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়। এই ধরনের ডায়াবেটিসের সঙ্গে জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস, স্থূলতা ও বংশগত কারণ গভীরভাবে জড়িত।
অগ্ন্যাশয়ের রোগ থেকেও কী ডায়াবেটিস হতে পারে?
হ্যাঁ, অগ্ন্যাশয়ের বিভিন্ন রোগ যেমন—
- • প্যানক্রিয়াটাইটিস
- • অগ্ন্যাশয়ের টিউমার
- • অগ্ন্যাশয় অস্ত্রোপচার
এই সব ক্ষেত্রেও ইনসুলিন উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে এবং ডায়াবেটিস দেখা দিতে পারে। একে সেকেন্ডারি ডায়াবেটিস বলা হয়।
অগ্ন্যাশয় সুস্থ রাখতে কী করবেন?
অগ্ন্যাশয় সুস্থ থাকলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়। এর জন্য—
- • অতিরিক্ত চিনি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন
- • নিয়মিত ব্যায়াম করুন
- • অ্যালকোহল সীমিত করুন
- • ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন
- • নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন
ডায়াবেটিস কোনো হঠাৎ হওয়া রোগ নয়, বরং এটি মূলত অগ্ন্যাশয়েরকার্যক্ষমতারসঙ্গেসরাসরিসম্পর্কযুক্ত। অগ্ন্যাশয় যদি পর্যাপ্ত ইনসুলিন তৈরি করতে না পারে বা শরীর যদি সেই ইনসুলিন ঠিকভাবে ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়, তাহলেই ডায়াবেটিস দেখা দেয়। তাই ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি হলো—অগ্ন্যাশয়কে সুস্থ রাখা এবং সচেতন জীবনযাপন করা।