ডায়াবেটিসের ৪টি ধরন: কোনটি কী এবং কেন জানা জরুরি?
বর্তমান সময়ে ডায়াবেটিস শুধু একটি রোগ নয়, বরং একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। জীবনযাত্রার পরিবর্তন, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ ও শারীরিক পরিশ্রমের অভাবে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। অনেকেই মনে করেন ডায়াবেটিস মানেই শুধু রক্তে চিনি বেড়ে যাওয়া, কিন্তু বাস্তবে ডায়াবেটিসের একাধিক ধরন রয়েছে, এবং প্রতিটির কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা পদ্ধতি আলাদা। তাই নিজের ও পরিবারের সুস্থতার জন্য ডায়াবেটিসের ৪টি প্রধান ধরন সম্পর্কে জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
টাইপ ১ ডায়াবেটিস কী?
টাইপ ১ ডায়াবেটিস একটি অটোইমিউন রোগ। এই ক্ষেত্রে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত অগ্ন্যাশয়ের ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষগুলোকে ধ্বংস করে দেয়। ফলে শরীর একেবারেই ইনসুলিন তৈরি করতে পারে না। এই ধরনের ডায়াবেটিস সাধারণত শিশু ও কিশোরদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, তবে যেকোনো বয়সেই হতে পারে।
টাইপ ১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিকে সারাজীবন ইনসুলিন ইনজেকশনের উপর নির্ভর করতে হয়। সাধারণ লক্ষণ: অতিরিক্ত তৃষ্ণা, ঘন ঘন প্রস্রাব, হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ক্লান্তি ও দুর্বলতা। সময়মতো চিকিৎসা না হলে এটি জীবননাশের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
টাইপ ২ ডায়াবেটিস: সবচেয়ে সাধারণ ধরন
টাইপ ২ ডায়াবেটিস সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এবং সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে বেশি হলেও বর্তমানে অল্প বয়সীদের মধ্যেও বাড়ছে। এই ক্ষেত্রে শরীর ইনসুলিন তৈরি করলেও তা ঠিকভাবে কাজ করতে পারে না, যাকে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বলা হয়।
এই ডায়াবেটিসের মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
অতিরিক্ত ওজন
অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস
শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা
পারিবারিক ইতিহাস
লক্ষণ: ক্ষত দেরিতে সারা, চোখে ঝাপসা দেখা, বারবার সংক্রমণ, ক্লান্তি।
ভালো খবর হলো, সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম ও ওষুধের মাধ্যমে টাইপ ২ ডায়াবেটিস অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (Gestational Diabetes)
গর্ভাবস্থায় কিছু মহিলার শরীরে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়, যাকে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বলা হয়। সাধারণত এটি গর্ভাবস্থার দ্বিতীয় বা তৃতীয় ট্রাইমেস্টারে ধরা পড়ে।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে সন্তান প্রসবের পর এই ডায়াবেটিস চলে যায়। তবে ভবিষ্যতে ওই মায়ের টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
ঝুঁকি: শিশুর অতিরিক্ত ওজন, অকাল প্রসব, ভবিষ্যতে শিশুর ডায়াবেটিসের ঝুঁকি।
তাই গর্ভাবস্থায় নিয়মিত ব্লাড সুগার পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।
অন্যান্য বিশেষ ধরনের ডায়াবেটিস
এই ধরনের ডায়াবেটিস তুলনামূলকভাবে কম হলেও গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে পড়ে—
জেনেটিক কারণে হওয়া ডায়াবেটিস
অগ্ন্যাশয়ের রোগজনিত ডায়াবেটিস
হরমোনজনিত সমস্যা বা কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় হওয়া ডায়াবেটিস
এই ধরনের ডায়াবেটিসের চিকিৎসা মূলত নির্ভর করে মূল কারণের উপর।
ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে কী করবেন?
ডায়াবেটিস সম্পূর্ণ সারানো না গেলেও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এর জন্য দরকার—
- • নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা
- • সুষম ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
- • প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়াম
- • চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ বা ইনসুলিন গ্রহণ
- • মানসিক চাপ কমানো ও পর্যাপ্ত ঘুম
ডায়াবেটিস সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকলে অনেক সময় রোগ ধরা পড়তে দেরি হয় এবং জটিলতা বাড়ে। তাই ডায়াবেটিসের চারটি ধরন সম্পর্কে সচেতন হওয়া, ঝুঁকির বিষয়গুলো চিহ্নিত করা এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়াই সুস্থ জীবনের চাবিকাঠি। সচেতনতা ও নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনই পারে ডায়াবেটিসকে হার মানাতে।